হবিগঞ্জে হাজারো দর্শনার্থী ও সেবা গ্রহীতাদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শেষ হলো উন্নয়ন-
এসএম সুরুজ আলী ॥ হাজার হাজার দর্শনার্থী ও সেবা গ্রহীতাদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে হবিগঞ্জ শহরের নিমতলায় জেলা প্রশাসন আয়োজিত ৩দিনব্যাপী উন্নয়ন মেলা গতকাল বুধবার শেষ হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে সোমবার এ মেলা শুরু হয়েছিল। মেলার ১ম, ২য় ও সমাপনী দিনে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় ছিল। মেলার স্টলেগুলো থেকে সাধারণ লোকজন শেষ দিনে চিকিৎসা সেবাসহ বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেছেন। অনেককে ভ্যাট, আয়কর রিটার্ণ গ্রহন ও আয়কর জমা প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভূমি অফিসের স্টল, স্বাস্থ্য বিভাগ, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, বিদ্যুৎ বিভাগ, নির্বাচন অফিস, বিআরটিএ হবিগঞ্জ সার্কেল এর স্টলসহ বেশ কয়েকটি স্টল থেকে সাধারণ লোকজন সবচেয়ে বেশি সেবা গ্রহন করেছেন। পরিকল্পিত পরিবার গঠন করা পরামর্শ যেমন পেয়েছেন, তেমনি অনেকেই বিদ্যুতের নতুন সংযোগ পেয়ে নিজের ঘর আলোকিত করার স্বপ্ন দেখছেন। আবার মেলা থেকে স্থানীয় সরকারকে কিভাবে শক্তিশালীকরণ, স্থানীয় সরকারের কর্মপরিকল্পনা, সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে, প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে কত টাকা ব্যয় হয়েছে তা জানতে পেরেছেন। কৃষকরা জেনেছেন কৃষি ক্ষেত্রে উন্নয়ন, কৃষি ঋণ গ্রহনের সুযোগ সুবিধাও। গতকাল সরেজমিনে মেলা প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, মানুষের উপচেপড়া ভিড়। এ সময় দর্শনার্থীদের সাথে আলাপকালে তারা জানান, অনেক আনন্দ নিয়ে এ ধরণের ব্যতিক্রম মেলা দেখার জন্য এসেছি। মেলা থেকে আমরা ভবিষ্যত জীবনে চলার পথের অনেক কিছু শিখেছি। এ ধরণের মেলা প্রতি বছর হওয়া প্রয়োজন। তবে মেলায় সরকারি বিভিন্ন কার্যক্রমের সুযোগ সুবিধা যেভাবে দেয়া হয়েছে, সেভাবে সাধারণত সরকারি সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় না। অনেক সাধারণ লোকজন বিভিন্ন স্টলের কার্যক্রম না জানায়, তারা সেবা গ্রহন করতে পারেননি। শেষ দিনে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের স্টলে গিয়ে দেখা গেছে, তরুণ-তরুণীদের ভিড়। তারা রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করছেন। এ স্টলে গাইনী, মেডিসিন, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞসহ ৩ জন চিকিৎসক দ্বারা তিন দিনে ৪ শতাধিক মানুষকে সেবা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে অধিকাংশই রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করেছেন। এ স্টলে দায়িত্বপ্রাপ্ত ডাক্তার রোজীনা রহমান জানান, গতকাল শেষ দিনেও স্টল থেকে দুই শতাধিক মানুষকে সেবা প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা বর্জ্য নিস্কাশনের কাউন্সিলিং, পুষ্টি বিষয়ে কাউন্সিলিং পরামর্শ দেয়া হয়েছে। ৩দিনে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের স্টলে গর্ভবতী শতাধিক মায়ের ব্লাড প্রেসার নির্ণয়, ওজন পরিমাপ, রুটিন চেক-আপ ও পরিবার পরিকল্পনা বিষয়ক পরামর্শ দেয়া হয়েছে। জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তর ও প্রতিবন্ধী সেবা সাহায্য কেন্দ্রের স্টল থেকে সরকারের নিরাপত্তা বেস্টনী আওতায় বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম ২০০৮-০৯ ও ২০১৬-১৭ অর্থ বছর পর্যন্ত উপকারভোগীর সংখ্যা ও ভাতার হার বৃদ্ধি তুলনা মুলক চিত্র তুলে ধরা হয়। প্রতিবন্ধী শনাক্তকরণ জরিপের আওতায় তাৎক্ষনিক পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়। এ স্টল থেকে অনেক প্রতিবন্ধী ফিজিওথেরাপী গ্রহন করেন। বিভিন্ন প্রকার কাউন্সিলিং করা হয়। এ স্টলে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালনকারী জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারি পরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, মেলা থেকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সেবাগুলো সহজে মানুষের দৌঁড়গোড়ায় পৌছানো হয়েছে। অনেক এ ধরণের সেবা পেয়ে আনন্দিত হয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। এছাড়া স্টলে দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোঃ জালাল উদ্দীন, প্রতিবন্ধী বিষয়ক কর্মকর্তা ফারজানা বিনতে মাহমুদ।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলা ভূমি অফিসের স্টল থেকে ৩দিনে নকল ও পর্চার ৩০১টি আবেদন গ্রহন করা হয়। এর মধ্যে ২৫৫টি প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া শতাধিক নামজারী আবেদন দেয়া হয়েছে। এসিল্যান্ড বিজন কুমার সিংহ জানান, স্বচ্ছতার সাথে পর্চা ও নামজারী আবেদনের আদেশ ও খতিয়ান প্রদান করা হয়েছে। যেগুলো বাকি রয়েছে তা পরে প্রদান করা হবে। বিআরটিএ হবিগঞ্জ সার্কেল এর স্টলে থেকে ৩দিনে অর্ধ শতাধিক লোকজনের ডিজিটাল রেজিস্ট্রেশনের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ছবি এবং ফিঙ্গার প্রিন্ট নেয়া হয়। গতকাল শেষ দিনে এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খান গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য বায়োমেট্রিক পদ্ধতির ছবি এবং ফিঙ্গার প্রদান করেন। বিআরটিএ এডি মোঃ আবু নাঈম জানান, ৩দিনে ৩০টি মোটরযানের রেজিস্ট্রেশন, ৫৬টির লার্নার লাইসেন্স, ১৫টি বায়ো এনরোলমেন্টকৃত ডিএল প্রদান, ১০টির ফিটনেস সার্টিফিকেট ও ২টির রেজিঃ টেক্স টোকেন প্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে ১৭টির টাকা গ্রহন করা হয়েছে। কাস্টমস এক্সাইজ ভ্যাট বিভাগের স্টলে ২দিনের ভ্যাটের ব্যাংকে জমা দেয়ার ২১ লাখ ৫৬ হাজার ৭৫৮ ট্রেজারী চালান গ্রহন করা হয়েছে এবং শেষ দিনে ৪ লাখ টাকার টেজারী চালান গ্রহন করা হয়। এলজিএসপি-প্রকল্প, স্থানীয় সরকার শাখার স্টল থেকে দর্শনীয় মাধ্যমে ৩দিনে দর্শনার্থীদের বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা বুঝিয়ে দেয়া হয়। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পষিদের আওতায় বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ, প্রাথমিক ও গনশিক্ষার হার বৃদ্ধি, উন্মুক্ত বাজেট সভা ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিভিন্ন কর্ম পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। নির্বাচন অফিসের স্টলে ৩দিনের ভোটার আইডি কার্ড সংশোধন, স্থান পরিবর্তনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বিষয়ের প্রায় ৩শতাধিক লোকজন সেবা গ্রহন করেন বলে জানিয়েছেন জেলা নির্বাচন অফিসার মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন চৌধুরী। বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের স্টল থেকে ১০টি নতুন বিদ্যুত সংযোগের আবেদন করা হয় এবং তাদের বাড়িতে শ্রীঘ্রই বিদ্যুতের আলো পৌছে দেয়ার আশ্বাস দেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ গ্রহন করা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়। নিয়মিত বিদ্যুত পরিশোধ পূর্বক সমিতির কর্মকান্ডে সহায়তার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। হবিগঞ্জ পল্লী বিদ্যুত সমিতি শায়েস্তাগঞ্জ এর স্টলে অদম্য বাংলাদেশ স্লোগানকে সামনে রেখে ৩দিন গ্রাহকদের বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হয় এবং ১৩টি অভিযোগ গ্রহন ও অনলাইনের মাধ্যমে ২৫টি নতুন সংযোগ আবেদন গ্রহন করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ পৌরসভার স্টল থেকে ৩দিনে ৬টি ট্রেড লাইসেন্স করা হয় ও শতাধিক জন্ম সনদ পৌর নাগরিকগন। জেলা প্রাণসম্পদ অধিদপ্তরের স্টলে উন্নত জাতের পশু পালনের পরামর্শ ও ভ্যাকসিন প্রদান করা হয়। হবিগঞ্জ উন্নয়ন সংস্থার স্টলে ৩দিনে রক্তের প্রেসারের পরিমান, রক্তের গ্রপ নির্ণয়, ডায়াবেটিকস পরিক্ষা করা হয়। এ স্টলে প্রায় ১২শত লোকজন সেবা নেন। উন্নয়নের গণতন্ত্র শেখ হাসিনা মূলমন্ত্র স্লোগানকে সামনে রেখে ৩দিন ব্যাপী মেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এলজিইডি স্টলে প্রদর্শনীর মাধ্যমে এ সরকারের উন্নয়ন তালিকা তুলে ধরা হয়। বর্তমান সরকারের শাসনামলে ২০০৯-২০১৬ অর্থ বছরে জেলার ৮টি উপজেলায় ৪৯০ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ কাজে মোট ২৩৯ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। বর্তমানে ৮০ কিলোমিটার সড়কের কাজ চলমান আছে। চলমান প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে আগামী দুই বছরে আরো ১৫০টি কিলোমিটার সড়ক নির্মিত হবে। এক সময়ে ৮টি উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স নির্মাণ-সম্প্রসারণ ৩টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ২১টি ও ২৬টি হাটবাজার/ঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। ১০টি কাজ চলমান আছে। চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে আগামী দুই বছরে আরো ৫টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, ৬টি হাটবাজার/ঘাট নির্মাণ করা হবে। এছাড়া এলজিইডির আওতায় আরো বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং আগামীতে আরো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের স্টলে তাদের প্রকল্পের আওতায় যেসব উন্নয়ন হয়েছে তা তুলে ধরা হয়। হবিগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্মিত স্থাপনা ও অবকাঠামো উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হয়।
মেলায় সাধারণ লোকজন হবিগঞ্জ জেলার সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সেবা গ্রহন করেন। গতকাল মেলা পরিদর্শন করেন এমপি অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খান, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএএন সিদ্দিক। সন্ধ্যায় ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ ও নাগরিক সেবায় উদ্ভাবন’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক সাবিনা আলমের সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সচিব এমএএন সিদ্দিক। অনুষ্ঠানে প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তাগণ বিশেষ অতিথি ছিলেন। সন্ধ্যায় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় ও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আগত শিল্পীরা সঙ্গীত পরিবেশন করেন।
-