জাতিসংঘের কর্মী তাফরিদা এখন রোহিঙ্গা শরণার্থী-
দিগন্তজুড়া ধানক্ষেত, নেই কোনো গাছপালা। এ রকম জায়গাতেই গতকাল সোমবার সকালে দেখা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ২০ থেকে ২৫টি পরিবার। অসহায় এই শিশু, বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির পুলিশ, সামরিক বাহিনী ও স্থানীয়দের সহিংসতার শিকার। তারা জীবন বাঁচানোর বিকল্প কোনো পথ না পেয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। শুধু এরা নয়, এ রকম প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা সম্প্রতি বাংলাদেশের পাহাড়, জঙ্গল, ক্ষেত, পথ পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছে। গত ২৪ আগস্ট মিয়ানমারের পুলিশ ক্যাম্প ও সেনানিবাসে রোহিঙ্গা বিদ্রোহী গোষ্ঠী হামলা চালালে তাদের ওপর নতুন করে এই সহিংসতা শুরু হয়। ধান ক্ষেতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের একটি দলের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল প্রায় ২০ বছর বয়সী একজন নারী ছোট বাচ্চাকে কলা খাওয়াচ্ছেন। তাফরিদা নামের ওই নারী ভাতিজাকে খাওয়াচ্ছিলেন। তাঁর মা তাহেরা বেগম, ছোট বোন ফাতেমা, বড় ভাই মোহাম্মদ আরিফ ও তাঁর স্ত্রী আশপাশেই আছেন।
তাফরিদার সঙ্গে কথা বলতে এগিয়ে যান এনটিভি অনলাইনের এই প্রতিবেদক। কথা বলার সময় প্রতিবেদক লক্ষ্য করলেন, তাফরিদা ইংরেজিতে উত্তর দিচ্ছেন। প্রতিবেদক অনেকটা চমৎকৃত হয়েই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনি ইংরেজিতে কথা বলতে পারেন?’ প্রত্যুত্তরে দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে তাফ্রিদা বলেন, তাঁদের পরিবারের সবাই শিক্ষিত। তাঁরা রাখাইন রাজ্যের বুচিডং থেকে এসেছি। এখানে আসার আগে জাতিসংঘের খাদ্যবিষয়ক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) একটি প্রকল্পের অধীনে রাখাইনে শিক্ষকতা করতেন। ২০১২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে তাফরিদা ডব্লিউএফপিতে যোগ দেন। কারণ মিয়ানমারের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সেখানে তাদের উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের কোনো অধিকার ছিলো না। তারা করতে পারতেন সরকারি চাকরিও। তাফরিদা স্বপ্ন দেখতেন, একদিন মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিকত্ব দেবে এবং তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন। কিন্তু মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় বৌদ্ধরা তাঁর সেই স্বপ্ন ধ্বংস করে দেয়। জাতিসংঘের যে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে, সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা তাফরিদা আজ নিজেই খাদ্য-সাহায্যপ্রার্থী। এই প্রতিবেদককে একপর্যায়ে তাফ্রিদা বলতে শুরু করেন সেই নির্মম কাহিনী। তাফ্রিদা বলেন, যখন সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় লোকজন তাদের গ্রামে নির্বিচারে গুলি চালায়, তাঁরা সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান এবং গ্রাম ছেড়ে পালান। কিন্তু অনেক গ্রামবাসীকে সামরিক বাহিনী নির্বিচারে হত্যা করে। ২৯ আগস্ট গ্রাম ছাড়ার পর তাঁরা ওই দিনই পালিয়ে বাংলাদেশের দিকে রওনা দেন। এই তরুণী জানান, গ্রাম ছেড়ে তাঁরা জঙ্গলে আশ্রয় নেন। ভয়ংকর ওই জঙ্গলে তাঁরা সব সময়ই ভয়ের মধ্যে থাকতেন। কিন্তু তার পরও ওই জঙ্গলের ভেতর দিয়ে টানা পাঁচদিন হেঁটে, সাঁতরিয়ে পার হন জলাশয়। বাংলাদেশের সীমান্ত পাওয়ার পরই মৃত্যু ভয়হীন বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পান তাঁরা। ডব্লিউএফপির সাবেক এই কর্মী বলেন, ‘আমরা খুব ছোট্ট একটা নৌকায় সীমান্তবর্তী নদী পার হই। নদীটা পাড় হওয়া ছিল খুবই ভয়ংকর একটা ব্যাপার। ভয়ংকর এই নদী পার হওয়ার আগে আমরা পাড়ে কয়েকদিন অপেক্ষাও করেছি, নিরূপায় হয়ে একপর্যায়ে এই ছোট্ট নৌকায় করে পার হই। আশ্রয় নিই আপনাদের বাংলাদেশে।’ ‘সম্ভ্রম ও জীবন বাঁচাতে আমরা মাতৃভূমি ছেড়ে পালিয়ে এসেছি। ভাবতেই পারি না, আমি শিক্ষিকা ছিলাম। এখন আমি অসহায় শরণার্থী। জানি না কোথায় যাব, কোথায় ঘুমাব। আমাদের ভবিষ্যৎ কী, সেটাও আমি জানি না এখন।’
তাফরিদা বলেন, ‘আমাদের অনেক অবিবাহিত মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। পিটিয়েছে, ধর্ষণ করেছে, করেছে নানাভাবে নির্যাতন। একপর্যায়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে সরকারি সামরিক বাহিনী ও স্থানীয় মগরা (বৌদ্ধরা)। আল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই রকম ভয়ংকর পরিস্থিতি থেকে আমরা পালিয়ে আসতে পেরেছি। নিরস্ত্র, সাধারণ মানুষের ওপর যে বর্বরতা চালানো হচ্ছে স্বচোখে না দেখলে, কেউ তা বুঝতে বা বিশ্বাসই করতে পারবে না।’ কথাগুলো বলার সময় চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরছিল তাফরিদার। কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘আমরা ভয়ংকর বিপদে আছি। বাংলাদেশে আমরা নিরাপদ। আমাদেরকে আশ্রয় দিয়ে জীবন বাঁচানোর জন্য বাংলাদেশকে ধন্যবাদ।’
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) মতে, নতুন করে সহিংসতা শুরুর পর প্রায় তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশ সরকার বলছে, মিয়ানমারে চলমান সহিংসতায় প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা মারা গেছে।
সূত্র: শেখ খলিলুর রহমান, এনটিভি অনলাইন

-