শিশু সাইফুলকে বাঁচাতে এগিয়ে আসুন...-
বইয়ের ব্যাগের বদলে সাইফুলের কাধে এখন ক্যাথেটারের ব্যাগ
স্টাফ রিপোর্টার ॥ দশ বছরের শিশু সাইফুল ইসলাম কাধে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে সহপাঠিদের সাথে স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কিডনির সমস্যার কারণে বইয়ের ব্যাগের পরিবর্তে ক্যাথেটারের ব্যাগ নিয়ে এখন ঘুরতে হয় তার সারা বেলা। সাইফুল ইসলাম হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বহরা ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া গ্রামের হত দরিদ্র কৃষক তাজুল ইসলামের ছেলে। তার চার ছেলের মধ্যে সাইফুল ইসলাম সবার ছোট। যে বয়সে সাইফুল ইসলাম বাড়ির পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার কথা ছিল। ঠিক তখনই অসুস্থ হয়ে চিকৎসার জন্য ভর্তি হতে হয় বাড়ি থেকে একশ কিলোমিটার দূরে বিভাগীয় শহরের একটি হাসপাতালে। চিকিৎসকরা বলেন সাইফুল কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও গতকাল বৃহস্পতিবার একটি বেসরকারি সংগঠন বিবেক সদস্যদের সাথে সাইফুলের বাড়িতে সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় দশ বছরের শিশু সাইফুল ইসলাম বাড়ির আঙিনায় খেলাধুলায় মগ্ন। বিবেকের সদস্য ও প্রতিবেদকে দেখে এগিয়ে আসে সাইফুল। গায়ে লাল হাফ হাতা শার্ট পরনে হাফ প্যান্ট। প্যান্টের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছে একটি ক্যাথেটারের নল। কাদে ঝুলিয়ে রাখছে প্র¯্রাব বহন করা ক্যাথেটারের ব্যাগটি। দেখলে বিশ্রী লাগলেও সাইফুলের কাছে বিগত দুই বছর ধরে এটি স্বাভাবিক। কারণ ক্যাথেটার নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে এটাই সাইফুলের ধারণা।
এলাকাবাসী ও তার পরিবার জানায় সাইফুলের বয়স যখন ছয় বছর হয় তখন থাকে স্কুলে ভর্তি করার কথা ছিল। ঠিক তখনেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পেট ফুলে গিয়ে প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যায়। স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা করালেও কোন কাজ হচ্ছে না। এ পর্যায়ে তাকে ভর্তি করা হয় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসক তাকে নানান পরিক্ষা নিরিক্ষা দেন। ধার দেনা করে তখন সাইফুলের চিকিৎসা করান তার বাবা তাজুল ইসলাম। তখন থেকেই ক্যাথেটারের সাহায্যে প্রস্রাব করতে হয়ে তাকে। কিন্তু সিলেটের চিকিৎসায় কোন উন্নতি হয়নি সাইফুলের। চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিলেও অর্থ যোগার করা তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। বাপদাদার বাড়ির ভিটা ছাড়া নেই কোন জমিজমাও। এক পর্যায়ে ছয় শতকের বাড়ি থেকে বিক্রি করে দেন দুই শতক ভূমি। এ ভুমি বিক্রি করে লাখখানেক টাকা পান তিনি। এ টাকায় কয়েক মাস চলে সাইফুলের চিকিৎসা।
সাইফুলের বাবা কৃষক তাজুল ইসলাম জানান গত দুই বছর ধরে অর্থের অভাবে সাইফুলের কোন চিকিৎসা করাতে পারছিনা। ক্যাথেটার দিয়ে প্র¯্রাব করতে হচ্ছে তাকে। কোন কোন সময় টান লেগে খুলেও যায় ক্যাথেটারটি। এ সময় তাকে নিয়ে উপজেলা সদরে দৌড়তে হয়। এখানে স্থানীয় চিকিৎসক দিয়ে পুনরায় নতুন ক্যাথেটার স্থাপন করতে হয়। এ সময় খরচ হয় প্রায় হাজার টাকা।
তাজুল ইসলাম বলেন বাড়ির জমি বিক্রি করে তাকে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন তার দুইটি কিডনির মধ্যে একটি অকেজো হয়ে গেছে। অন্যটি আংশিক অকেজো। তাকে সুস্থ করে তুলতে হলে উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন। কিন্তু উন্নত চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। এত টাকা যোগাড় করা আমার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তাই গত দুই বছর ধরে তার চিকিৎসা বন্ধ।
সাইফুলের মা রানু বেগম বলেন সাইফুলের ইচ্ছে লেখাপড়া করা। এ জন্য প্রতিবছরই জানুয়ারী মাসে বাড়ির পার্শে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে যাই। কিন্তু শিক্ষকরা তার গলায় ক্যাথেটার দেখে ভয় পেয়ে যায়। তারা বলে তোমার ছেলে স্কুলে এলে কোন সময় কোন ছেলে ক্যাথেটারে টান মেরে দুর্ঘটনা ঘটায়। এ ভয়ে ভর্তি করতে বারণ করেন তারা।
সাইফুলের চিকিৎসার জন্য বেসরকারি সংগঠন “বিবেক সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সদস্যরা গত এক সপ্তাহ ধরে অর্থ সংগ্রহে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তাদের সদস্যরা ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা সাইফুলের চিকিৎসা তহবিলে জমা রেখেছেন। যদি কেউ অর্থিক সহযোগিতা করতে চান। তাহলে বিবেক সভাপতি ও প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হাসানের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। যোগাযোগের জন্য ০১৭১১৯৭৭৩১৭।
মাধবপুর উপজেলার বেসরকারি বিবেক সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সভাপতি সাব্বির হাসান বলেন সাইফুল ইসলামের চিকিৎসার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। অর্থ সংগ্রহের জন্য বিবেক সদস্যরা তাকে অর্থিক সহযোগিতা করবে এবং অর্থ সংগ্রহের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাবে। তার জন্য সকলকে এগিয়ে আসার আহবান জানান বিবেক সভাপতি।
সাইফুলকে বিদ্যালয়ে ভর্তি না করা প্রসঙ্গে ঘোনাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শফিকুর রহমান বলেন তার বয়সটি এখনো নির্ধারণ করতে পারিনি। তাই তাকে বিদ্যালয়ে ভর্তি করিনি। তার বয়স দশ বছর হয়েছে এবং তার মা ভর্তি করাতে বিদ্যালয়ে গিয়েছিল। শিক্ষকরা ক্যাথেটার দেখে ভর্তি করে বললে তিনি প্রতি উত্তরে বলেন এটিও একটি সমস্যা।
-