হবিগঞ্জ শহরে জমে উঠেছে বৃক্ষমেলা-
জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মাধবপুরের বদু মিয়ার ফলের স্টলে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়
এসএম সুরুজ আলী ॥ হবিগঞ্জ শহরের নিমতলা কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসন, বন বিভাগ এবং জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আয়োজিত বৃক্ষমেলা জমে উঠেছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মেলায় জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে দর্শনার্থীরা এসে ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই বাসা-বাড়িতে লাগানোর জন্য তাদের পছন্দের ফলজ ও বনজ গাছগাছালি ক্রয় করে নিচ্ছেন। তবে এর মধ্যে গাছের দাম বেশি বলে ক্রেতারা জানিয়েছেন। অপরদিকে মেলায় হবিগঞ্জের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক মাধবপুরের বদু মিয়ার ফলের স্টলে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। গত দু’দিনে বদু মিয়া মেলায় প্রায় ৩০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। তার জমিতে ফলানো ফলগুলো খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ক্রেতারা ক্রয় করছেন। দর্শনার্থীরা ফলগুলো দেখছেন আর কিভাবে চাষ করা যায় বদু মিয়ার কাছ থেকে পরামর্শ নিচ্ছেন। গতকাল দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে মেলায় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। দর্শনার্থীদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থী, যুবক, যুবতী ও মধ্য বয়সী নারী পুরুষ। এছাড়া বিভিন্ন স্কুল কলেজের শিক্ষকরা মেলা পরিদর্শন করছেন। যেসব শিক্ষক মেলা পরিদর্শন করেছেন তারা জানিয়েছেন, মেলায় স্টলগুলোর অনেকেই নিজেদের নার্সারীর চাষকৃত গাছ নিয়ে এসেছেন। তারা কোন প্রযুক্তিতে গাছের উৎপাদন করেছেন সেই ব্যাপারে অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন। আর কোন গাছ বাসা-বাড়িতে লাগানোর পর দ্রুত বেড়ে উঠবে, ফলও তাড়াতাড়ি ধরবে এ বিষয়গুলো সম্পর্কে অনেকে ধারণা নিচ্ছেন। মেলায় ফলজ গাছের মধ্যে আম বারমাসী, আম ল্যাংড়া, আম মল্লিকা, আম সুবর্ণারেখা, আম গোপালভোগ, আম হিমসাগর, আম রূপালী, আম কোনাই, আম দেশী, আম বীজ, আম ফজলী, কাঁঠাল বারমাসী, কাঁঠাল হাজারী, কাঁঠাল কলুম, লেচু চায়না, লেচু বেদনা, লেচু বোম্বাই, আম থা, বাউ নাসপাতি জামরুল, বাউ মিষ্টি জাম্বুরা, জামরুল হাইব্রীড, জামরুল, জাম্বুরা, দেশীয় আমড়া, মিষ্টি বীজের তেঁতুল, কমলা-১, কমলা-২, কমলা-৩, চাইনিজ কলা, আপেল, সফেদা, গোলাপ জামসহ বিভিন্ন ধরণের ফলজ গাছ উঠেছে। ফুল গাছের মধ্যে নাইট কুইন, সেঞ্চুরী ফ্লাওয়ার, মে ফ্লাওয়ার-১ মে ফ্লাওয়ার-২ মরিচফুল, মালতী, পলিগাছ, চাম্পা, কাঁঠালীচম্পা, বেলী, হিমালতী, ইনকা, নাকপট-১, নাকপট-২, আলমেন্ডা, ডালিয়া-১, ডালিয়া-২, ডালিয়া-৩, হিলপট-১, হিলপট-১, হিলপট-৩সহ বিভিন্ন ধরণের ফুলের গাছ উঠেছে। ঔষধি গাছের মধ্যে আমলকি, হরতকি, বয়রা, কালোমেঘ, পেস্তবাদাম, ওলটকমল, তুলসী-১, তুলসী-২, তুলসী-৩, হাড়জোড়া, শতমুল, রক্তচন্দন, পান্থপাতা, অর্জুন, নিম, পাথরকুচি-১, পাথরকুচি-২সহ বিভিন্ন প্রজাতির ঔষধি গাছ উঠেছে।
মেলায় মাধবপুরের চৌমুহনী ইউনিয়নের গোপিনাথপুরের বাসিন্দা জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষক বদু মিয়ার মাহমুদ বক্ত (রহঃ) তথ্য ও প্রযুক্তি খামারের উৎপাদিত ফলগুলো দেখার জন্য দর্শনার্থীরা ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই বদু মিয়ার খামারে ফলানো ফল ক্রয় করছেন। বদু মিয়ার স্টলের ফলগুলো দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক আ.ব.ম ফখরুদ্দীন খান পারভেজ ও প্রভাষক মুসলেহ উদিনের নেতৃত্বে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা দেখেন। এ সময় বদু মিয়া শিক্ষক/শিক্ষার্থীদের তার খামারের ফল কেটে খেতে দেন। শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা বদু মিয়ার খামারের উৎপাদিত ফল খেয়ে প্রশংসা করেন। প্রভাষক আ.ব.ম ফখরুদ্দীন খান পারভেজ জানান, বদু মিয়ার খামারের ফলগুলো দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি খেতে সুস্বাদু। এ ফলগুলোতে কোন প্রকার ফরমালিন নেই। যে কারণে ক্রেতারা বদু মিয়ার স্টলে ভিড় জমাচ্ছেন। এছাড়াও তিনি জানান, মেলায় বিভিন্ন ধরণের ফলজ ও বনজ গাছগুলো আমরা দেখেছি। আমাদের ছাত্রদের গাছ, ফল উৎপাদনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন হবে বলে মনে করি। খামারী বদু মিয়া জানান, তিনি তার খামারে দেশী ও বিদেশী ফল উৎপাদন করেন। এছাড়াও সবজিও উৎপাদন করেন। তিনি বলেন- বিদেশী ফল কেনিয়া, তরমুজ, সুইট, ব্লেক-২ সাম্মা ফল, হানেন্ডু, বড় মেমন, অ্যাকশন ফুড, ভিতরে হলুদ তরমুজ উৎপাদন করেন। তিনি বলেন এ ফলগুলো প্রাকৃতিক নিয়মে পাকানো হয়। কোন ধরণের ফরমালিন প্রয়োগ করা হয় না। আমার স্টলে দর্শনার্থী ও ক্রেতারা ভিড় জমাচ্ছেন। অনেকেই আমার উৎপাদিত সুস্বাদু ফল ক্রয় করছেন। প্রভাষক মোস্তাকিম আহমেদ জানান, প্রতি বছর মেলা থেকে বিভিন্ন ফলজ ও বনজ গাছ ক্রয় করতে আসি। এবার গাছ ক্রয় করতে এসেছি এবং বনজ ও ফলজ কয়েকটি গাছ ক্রয় করেছি। তবে দাম বাজারের চেয়ে মেলায় অনেকটা বেশি। স্টলগুলোতে গাছের দাম একটু কমালে আরও বেশি বিক্রি হতো। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার গজারিয়াকান্দি গ্রামের সায়েদ মিয়া জানান, মেলায় গাছ ক্রয় করতে এসেছিলাম। কিন্তু বাজারের চেয়ে মেলায় গাছের দাম বেশি নেয়া হচ্ছে। এজন্য গাছ ক্রয় করিনি। তবে বাজার কিংবা নার্সারীতে গিয়ে গাছ ক্রয় করবো। বিউটি ফ্লাওয়ার নার্সারীর স্বত্ত্বাধিকারী মোঃ আব্দুল মতলিব জানান, তার স্টলে বিভিন্ন শ্রেণী পেশার দর্শনার্থীরা প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন। ক্রেতারা বিভিন্ন ধরণের ফলজ ও বনজ গাছ ক্রয় করছেন। আশা করি ক্রেতাদের ভিড় অব্যাহত থাকবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) হবিগঞ্জ সদর উপজেলা শাখার সহ-সম্পাদক মঈন উদ্দিন আহমেদ জানান, বৃক্ষ রোপন অভিযান শুরু হলেই সরকারসহ বিভিন্ন এনজিও ও সংস্থা বিনামূল্যে গাছের চারা বিতরণ করে থাকে। বিতরণকৃত চারার মধ্যে অধিকাংশই থাকে মেহগণি, আকাশী, ক্রস, মেনজিয়ামসহ বিভিন্ন প্রজাতির বিদেশী গাছ। যা আমাদের পরিবেশের জন্য কতটা উপকারী, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও ২/৪টি ফলের গাছও বিতরণ করা হয়। যা অতি নগন্য। এ সকল গাছ থেকে শুধুমাত্র কাঠ পাওয়া যায়। আর দেশীয় ফলের গাছ রোপন করলে তা থেকে কাঠ, ফল ও জীবন রক্ষাকারী অক্সিজেনসহ নির্মল এবং বিশুদ্ধ বায়ু পাওয়া যায়। এছাড়া এ সকল গাছে যে ফল ধরে তা পশু পাখিসহ বণ্যপ্রাণীদেরও আহার যোগায়। যা বিদেশী গাছ থেকে পাওয়া যায় না। তাই তিনি বৃক্ষরোপন অভিযান চলাকালে বিদেশী গাছ না লাগিয়ে বেশি করে পরিবেশ বান্ধব দেশীয় গাছ লাগানোর আহ্বান জানান।
বন বিভাগের মামলার পরিচালক সমিরণ সরকার জানান, মেলায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থী ভিড় করছেন। মেলা থেকে অনেকেই বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ক্রয় করে নিচ্ছেন। আমরা মেলায় শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সার্বক্ষনিক অবস্থান করছি।
উল্লেখ্য, গত সোমবার ‘অপ্রতিরোধ্য দেশের অগ্রযাত্রা ফলের পুষ্টি দেবে নতুন মাত্রা’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে কালেক্টরেট প্রাঙ্গণে নিমতলায় ৭ দিনব্যাপী বৃক্ষরোপন অভিযান, বৃক্ষ এবং ফলদ বৃক্ষ মেলার উদ্বোধন করা হয়। মেলার উদ্বোধন করেন হবিগঞ্জ সদর-লাখাই আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মোঃ আবু জাহির। মেলায় সর্বমোট ১৯টি স্টল অংশ নিয়েছে। এর মাঝে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুইটি ফল প্রদর্শনী এবং বন বিভাগের ২টি বনজ বৃক্ষ প্রদর্শনী রয়েছে। বাকী ১৭টি স্টল স্থানীয় নার্সারী মালিকদের। স্টলগুলোতে নানা জাতের দেশী-বিদেশী ফল, ওষুধি, কাঠের বৃক্ষ এবং প্রাকৃতিক শোভা বর্ধনকারীসহ হরেক রকম বৃক্ষের চারা রয়েছে।
-