বানিয়াচঙ্গ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেতে প্রার্থীদের লবিং-
এসএম সুরুজ আলী ॥ হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন পেতে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে বেশি। বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তেমন কোন প্রচারণায় দেখা যায়নি। গত ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহজোটের নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করার পর আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা উপজেলা নির্বাচন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট জাতীয় সংসদ নির্বাচন কারচুপিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুননির্বাচনের দাবি জানান। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারের অধিনে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করবে কি না তা নিয়ে এখন সব মহলেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে ২ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেছেন যেসব উপজেলা পরিষদের মেয়াদ জুলাই মাসে শেষ হচ্ছে ওইসব উপজেলার নির্বাচন ৩১ মার্চের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের। আর জুলাই’র পরে যেসব উপজেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হবে সেগুলোর নির্বাচন পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে করা হবে বলে জানান নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। এরপর থেকে হবিগঞ্জ জেলার ৯টি উপজেলার সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ভাইস চেয়ারম্যান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান প্রার্থীদের তৎপরতা দেখা দেয়।
সম্প্রতি হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য ২৫ নেতাকর্মীদের নাম শোনা যাচ্ছে মর্মে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। সংবাদ প্রকাশের পর অনেক সম্ভাব্য প্রার্থী দৈনিক খোয়াই’র এ প্রতিনিধির সাথে যোগাযোগ করে তারাও দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী বলে জানান। এবারই প্রথম দলীয় পরিচয়ে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে সরকারী দলের মধ্যে প্রত্যেকটি উপজেলায় একাধিক প্রার্থী রয়েছে। এসব প্রার্থীদের মধ্যে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দৈনিক খোয়াইয়ে ধারাবাহিকভাবে হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলার সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করা হবে।
আজ তুলে ধরা হলে বানিয়াচং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণার সংবাদ।
১৫টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত বানিয়াচং উপজেলা। এ উপজেলার মোট ভোটার ২ লাখ ২৮ হাজার ৯৯৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ১৩ হাজার ৬৬২ ও মহিলা ১ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৭ জন। বিগত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে ৩৪ হাজার ২৪৬ ভোট পেয়ে এ উপজেলার চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন বিএনপি’র মনোনীত প্রার্থী শেখ বশির আহমেদ। এ নির্বাচনে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বি ছিলেন সুবিদপুর ইউনিয়নের পরপর দুবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান সাবেক ছাত্রনেতা আবুল কাশেম চৌধুরী। তিনি পেয়ে ছিলেন ২৪হাজার ৩৪০ ভোট। নির্বাচনে ২২ হাজার ১১৪ ভোট ৩য় স্থান অর্জন করেছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার। ১৭ হাজার ৪৮২ ভোট পেয়ে ৪র্থ স্থান অর্জন করেছিলেন তৎকালীন বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান উপজেলা আওয়ামী লীগের। দীর্ঘদিনের পরিক্ষিত সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খানের মধ্যে সে সময় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্য দেখা দেয়ার কারণে আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনে মূলত ঐক্যবদ্ধ হতে পারেনি। সিদ্ধান্তহীনতার কারণে দলটি একাধিক প্রার্থী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এ সুযোগে বিএনপির প্রার্থী শেখ বশির আহমেদ নির্বাচিত হয়েছেন বলেই সব মহলে আলোচনা রয়েছে। অপরদিকে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে এ নির্বাচনে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আমীন চৌধুরী থাকলেও তিনি বিএনপি’র ভোটে প্রভাব ফেলতে পারেননি। এ নির্বাচনে নুরুল আমীন চৌধুরী পেয়েছিলেন ১২ হাজার ৪৬ ভোট। এ নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপি জোটের জামাতের প্রার্থী ইকবাল বাহার খান, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী তানিয়া খানম নির্বাচিত হন। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের কারণ হিসেবে দলীয় কোন্দলকে দায়ী করা হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীর ভোটের সাথে আওয়ামী লীগের ৪প্রার্থীর ভোট মেলানো হলে দেখা যায় অনেক এগিয়ে আওয়ামী লীগ। এবার জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের বিরোধ নিস্পত্তি হয়েছে। এ বিরোধ নিস্পত্তির পূর্বেই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন খান নিজেদের দ্বন্দ্ব মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেন। একটি সূত্র জানায়, ইকবাল হোসেন খান ও আমির হোসেন মাস্টারের মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন, দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি সংসদ নির্বাচন করবেন। দলীয় মনোনয়ন না পেলে তিনি উপজেলা নির্বাচনে আর অংশ নেবেন না। উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান চেয়ারম্যান পদে দলীয় মনোনয়ন চাইবেন। আর তার পক্ষে আমির হোসেন মাস্টার কাজ করবেন। এ হিসেবে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান তার সভাপতি আমির হোসেন মাস্টারকে সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কেন্দ্রে জোর লবিং শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বর্তমান সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ খানই দলীয় মনোনয়ন পান। এদিকে এবার সরাসরি দলীয়ভাবে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হবে বিধায় আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীরা কেন্দ্রে জোর লবিং শুরু করেছেন।
সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, এলাকায় লিফলেট, পোস্টার লাগিয়ে প্রচারণা করেছেন ও প্রার্থী হিসেবে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তারা হলেন- বানিয়াচঙ্গে উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার, সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেন খান, বানিয়াচঙ্গ উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা সুবিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী, প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা ইউপি চেয়ারম্যান হায়দারুজ্জামান খান ধন মিয়া, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মক্রমপুর ইউপি চেয়ারম্যান আহাদ মিয়া, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মোস্তফা কামাল আজাদ রাসেল। বিএনপি’র প্রার্থী হিসেবে বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ বশির আহমেদ, উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সভাপতির অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন, উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আকাদ্দছ তালুকদার, জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে মকছুদুজ্জামান খান, জাতীয় ছাত্র সমাজের অ্যাডভোকেট ছাদিকুর মিয়া তালুকদার, কমিউনিস্ট পার্টির জেলা সদস্য ইমদাদুল হোসেন খানের নাম শোনা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশী উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি আমির হোসেন মাস্টার জানান, আমি দলের একজন কর্মী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন চাইবো। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করবো। মনোনয়ন না পেলে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেবো। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন খান জানান, দলীয় মনোনয়ন চাইবো। দল মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচন করবো। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে আমি যাবো না। সুবিদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম চৌধুরী জানান, আমি বিগত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করি। বিগত নির্বাচনে ফলাফল আর মাঠ জরিপ করে মনোনয়ন দিলে আমি আশা করি দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। দলীয় মনোনয়ন পেলে এবার আমি বিপুল ভোটের ব্যবধানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবো। আওয়ামী লীগের অন্যান্য সম্ভাব্য প্রার্থীরাও দলীয় মনোনয়ন চাওয়ার কথা জানান। মনোনয়ন না পেলে তারা দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নেয়ার কথা জানান। বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান শেখ বশির আহমেদ জানান, বিগত নির্বাচনে ১০ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। এবার আশা করছি, সরকার সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে ও জনগণ ভোট দেয়ার সুযোগ দিলে ধানের শীষের প্রার্থীকে জনগণ বিপুল ভোটে নির্বাচিত করবেন। আমরা সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছি। সাংবাদিক ইমদাদুল হোসেন খান জানান, বামজোট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিলে আমাকে মনোনয়ন দেবে। মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবো।

-