হবিগঞ্জে সফলতার উদাহরণ সৃষ্টিকারী চারজনকে সম্মাননা দিলো কালেরকণ্ঠ-
স্টাফ রিপোর্টার ॥ দেশের জনপ্রিয় জাতীয় দৈনিক কালেরকণ্ঠের ১০ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে হবিগঞ্জের শুভসংঘ সমাজে উদাহরণ সৃষ্টিকারী ৪ জনকে সম্মাননা জানিয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ক্ষেত্রে শিক্ষকতা, অভিভাবকত্ব এবং শিক্ষার্থী হিসাবে সবার মাঝে উদাহরণ সৃষ্টি করায় এই সম্মাননা জানানো হয়। যাদেরকে সম্মাননা জানানো হয় কারা হলেন সরকারী বৃন্দাবন কলেজের উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব, উচাইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় এর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মো. জাকির হোসেন, জেলা খাদ্য অধিদপ্তরের অফিস সহায়ক আ. রহমান বাবুল ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুবিনয় দেবনাথ।
সম্মাননা পাওয়া ড. সুভাষ চন্দ্র দেবনাথ একজন কৃতি শিক্ষক ও গবেষক। তিনি সিলেট বিভাগ থেকে  প্রথম ব্যক্তি হিসাবে গত বছর সারা দেশের শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছিলেন। সারা দেশের প্রখ্যাত শিক্ষকদের সাথে প্রতিযোগিতায় তার উদ্ভাবনী চিন্তা, একাগ্রতা এবং শিক্ষকতা পেশার প্রতি কমিটমেন্টের জন্য সেরা পুরস্কার পান। তিনি হবিগঞ্জে শিক্ষার্থীদেরকে আলোর পথ দেখান। একাডেমিক শিক্ষার বাহিরেও শিক্ষার্থীদের মান উন্নয়ন এবং মানব সম্পদে রূপান্তরের প্রচেষ্টা ইতোমধ্যে সকল মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাকে দেখে অন্যান্য শিক্ষকরাও অনুপ্রাণিত হন। বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডেও তার অংশগ্রহণ রয়েছে।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা উচাইল গ্রামে ১৯৭৩ সালে উচাইল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়। এলাকার শিক্ষিক যুবক হিসাবে প্রতিষ্ঠার সময় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করেছিলেন মো. জাকির হোসেন। পরে ভাল চাকুরীর অনেক সুযোগ আসলেও এলাকার শিক্ষার উন্নয়নে জীবন যৌবন বিলিয়ে দেন শিক্ষকতা পেশায়। টানা ৪১ বছর শিক্ষকতাকালে তিনি এলাকার তিন প্রজন্মকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে ২০১৪ সালে অবসরে যান। এই সময়ে তার হাতে সৃষ্টি হয় অনেক দেশ বরেণ্য ব্যাক্তি। শুধু এলাকার মানুষজনকে নয়, তিনি একজন সফল পিতাও। তর বড় ছেলে আজিজুর রহমান সরকারের একজন উপ-সচিব। অন্য সন্তানরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। তাকে এলাকায় সবাই একজন আদর্শ শিক্ষক এবং সফল পিতা হিসাবে উদাহরণ দিয়ে থাকেন। কিন্তু গ্রামে বসবাস করায় যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি তার। এবার তিনি সম্মাননা পেয়ে আবেগে আপ্লুত হন।
আব্দুর রহমান বাবুল হবিগঞ্জ খাদ্য অধিদপ্তরের একজন অফিস সহায়ক (৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী)। কাজের প্রতি অন্তপ্রাণ এবং একজন ধার্মিক মানুষ হিসাবেই সবাই তাকে চিনে। অফিসেও তার অনেক সুনাম। তিনি ৩ কন্যা সন্তানের জনক। অন্যরা কন্যা সন্তানকে যেখানে সমাজের বোঝা মনে করেন সেখানে তিনি নিজের আর্থিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও তাদেরকে আলোকিত মানুষ করে সমাজে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। তার বড় মেয়ে নিলুফা ইয়াসমিন সুমী এমবিবিএস ডিগ্রী শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেছে। ২য় মেয়ে সাবিনা ইয়াসমিন এমবিবিএস সম্পন্ন করেছে। ৩য় মেয়ে ফাতেমা ইয়াসমিন এমবিবিএস ২য় বর্ষের ছাত্রী। তিনি একই সাথে দুটি বিষয় প্রমাণ করেছেন। একটি হল কন্যা সন্তান কোন দায় নয়। আবার আর্থিক সীমাবদ্ধতাও কোন সমস্যা নয়, যদি ইচ্ছা শক্তি এবং প্রচেষ্টা থাকে।
সুবিনয় দেবনাথের পিতা সন্তোষ দেবনাথ ছিলেন একজন দর্জি। দরিদ্র পরিবারে নুন আনতে পান্তা পুরায় অবস্থা। সম্পত্তি বলতে একটি মাটির ঘর। এরই মাঝে পিতা সন্তোষ দেব নাথ আক্রান্ত হয় মরণব্যাধি ক্যান্সারে। ৬ মাস চিকিৎসা করাতে গিয়ে একেবারে নিঃস্ব হয়ে যায় সুবিনয় এর পরিবার। এরই মাঝে সুবিনয় এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে জিপিএ-৫ পায়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে সুযোগ পায় ব্যবস্থাপনা বিভাগে। কিন্তু ভর্তির টাকা যোগার করতে না পারায় পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হবে না সুবিনয়কে। এরই মাঝে গত সপ্তাহে তার পিতার মৃত্যু হয়। বিষয়টি শুভ সংঘের নজরে আসলে তারা বিভিন্ন স্থান থেকে সহায়তা নিয়ে গত ৩ জানুয়ারী সুবিনয়কে ভর্তি করায়। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন ও এগিয়ে আসে তাকে সহায়তায়। প্রতিকুল পরিস্থিতিকে জয় করে উদাহরণ সৃষ্টি করায় সম্মাননা জানানো হয় সুবিনয়কে।
বৃহস্পতিবার সকালে হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবে শুভ সংঘ আয়োজিত কালেরকণ্ঠের ১০ম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে উদাহরণ সৃষ্টিকারী ৪ জনের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবীর মুরাদ।
কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি ও হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাহ ফখরুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ উল্ল্যা, হবিগঞ্জ সরকারী মহিলা কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক নজমুল হক, হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সভাপতি হারুনুর রশিদ চৌধুরী, সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সুভাষ চন্দ্র দেব, হবিগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুধাংশু কুমার কর্মকার, শুভ সংঘ হবিগঞ্জের সভাপতি কবি ও নাট্যকার রুমা মোদক।
-