বৈশাখেও আগের মতো কদর নেই মৃত শিল্পীদের-
মো. নূরুল হক কবির ॥ আগেকার দিনে চইত (চৈত্র) মাসের শেষের দিকেই মাটির গরু, ছাগল, ব্যাংকসহ কত জাতের জিনিসপত্র বাইতে লাগতাম (তৈরী শুরু করতাম)। পুরা (পুরো) বৈশাখ মাস জুইড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুইরা ঘুইরা বেছতো মরদনারা (ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতো পুরুষরা)। এক মাসেই রুজিতে অইয়্যা যাইতো ৩-৪ মাসের সংসার খরচ। কিন্তু গেল কয়েক বৎসর ধইরা বৈশাখ মাস আইলে আমরারে কেউ জিগায় না। জিনিসপত্র তৈরী করলেও বেছতাম পাড়ি না আগের মতন। অহন বৈশাখ মাস আইলে আমার আর কদর তাহে না (চাহিদা থাকে না)।
এভাবেই কাছে দু:খ প্রকাশ করেন হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার নগর কুমার পাড়ার কণিকা দাস। তিনি বলেন, তাদের পাড়ায় শতাধিক পরিবারের বসবাস। যাদের আয়ে পথ একটাই- মাটির তৈরী জিনিসপত্র বিক্রি। এই আয় দিয়েই চলতো সংসার। কিন্তু মানুষজন এখন আর বাংলার ঐতিহ্যবাহী মাটির জিনিসপত্রে মজে না। গ্রামে গ্রামে মেলার আয়োজন হলেও পূর্বের মতো জমে না। মানুষজন আধুনিকতার দিকে ঝুঁকে পড়ায় এসব ক্রয়ে আগ্রহ নেই কারো। এতে তাদের জীবন ধারণ হয়ে পড়েছে অত্যন্ত কষ্টকর।
একই এলাকার মুকুল পাল বলেন, তার মা শিলা দাস মাসের পর মাস কাজ করে তৈরী করতেন হাজার হাজার মাটির জিনিসপত্র। বৈশাখের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বিক্রি করতেন মেলায় মেলায় ঘুরে। কিন্তু দিন দিন কালের আবর্তে বিলীন হয়ে যাচ্ছে তাদের এই শিল্প। এ ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
কানাই লাল দাস বলেন, পূর্ব পুরুষের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য এখনও তিনি এই পেশায় জড়িত রয়েছেন। আয়-রোজগার না থাকায় অনেকেই পেশা বদল করে অন্য কাজে লেগে পড়েছেন। সন্তানদের লেখাপড়া তো দূরে থাক, সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে তার পক্ষে। তিনিও অন্য কোনও কাজ পেলে এই পেশা ছেড়ে দিবেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু আজমিরীগঞ্জেই নয়; জেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় অর্ধশত কুমার পাড়া রয়েছে। তাদের অনেকেই এখন এই পেশা থেকে সড়ে দাঁড়াচ্ছেন। এতে বাংলার ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প দিন দিন বিলুপ্তির দিকে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন অভিজ্ঞ মহল।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জহিরুল হক শাকিল বলেন, উন্নত দেশগুলোতে তাদের নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য রক্ষায় সহায়ক জনগোষ্ঠীকে ধরে রাখতে ভর্তুকী প্রদান করে থাকে। শুধু কুমার নয়, বাংলাদেশের অনেক শিল্প কালের আবর্তে হারিযে যাচ্ছে। বাঙালি ঐতিহ্য রক্ষার স্বার্থে এদের ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে সরকার।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ফজলুল জাহিদ পাভেল বলেন, ঐতিহ্যবাহী এই হস্তশিল্প ধরে রাখতে কাজ করছে সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় আসন্ন পহেলা বৈশাখে হবিগঞ্জেও তিনদিনব্যাপি মেলার আয়োজন রয়েছে। সেখানে স্থাপন হবে ২০ থেকে ২৫টি স্টল। এসব স্টলে মাটির জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন হস্ত ও কুটির শিল্প সামগ্রী থাকবে বলে আশাবাদী তিনি।
-