আজ পহেলা বৈশাখ-
নতুন বছরকে বরণ করতে হবিগঞ্জে নানা আয়োজন
নববর্ষে পান্তার সাথে ইলিশ না খাওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা 
মঈন উদ্দিন আহমেদ ॥ আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা বছরের প্রথম দিন। দিনভর সারাটা দেশ মেতে উঠবে নাচে-গানে, উৎসবে-আনন্দে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উৎসবের রঙে মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। এদিন শুধু আনন্দ-উচ্ছ্বাসই নয়, সব মানুষের জন্য কল্যাণ কামনারও দিন। কালের পরিক্রমায় বাংলা ১৪২৫ সালকে বিদায় জানানোর পাশাপাশি আজ নতুনের আবাহনে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে মেতে উঠবে জাতি। সুখ-শান্তি-সমৃদ্ধি ও কল্যাণের প্রত্যাশা নিয়েই মহাধুমধামের সাথে বাঙালি উদযাপন করবে নববর্ষ। একে অন্যকে বলবে শুভ নববর্ষ। বাংলা নববর্ষ এখন আমাদের প্রধান জাতীয় উৎসবও। বৈশাখী উৎসবের মধ্যে দিয়ে বাঙালি তার শেকড় খুঁজে পায়। জীবন সংগ্রামী মানুষগুলো প্রতিনিয়ত বাঙালিয়ানার যে নিজস্বতা আছে সেটা ধরে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করে। পয়লা বৈশাখে প্রকৃতিও যেনো নতুন জীবন ফিরে পায়। এইদিনে সকলে পান্তা ইলিশ খাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও এইবার পান্তার সাথে ইলিশ থাকছে না।
হবিগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) ফজলুল জাহিদ পাভেল জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পান্তার সাথে ইলিশ না খাওয়ার ঘোষনা দিয়েছেন। তাই এবার হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন পান্তার সাথে ইলিশ খাওয়া বর্জন করেছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যাদেরকে পান্তা খাওয়ানো হবে তাদেরকে পান্তার সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দের খাবার পান্তার সাথে শুটকি দিয়ে আপ্যায়ন করানো হবে। 
বৈশাখের প্রথম দিনে হবিগঞ্জের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রঙিন রূপ ধারণ করে। বাহারী রঙে সাজানো হয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। আয়োজন করা হয় নানা অনুষ্ঠানমালার। নতুন শাড়ি ও পাঞ্জাবী পরে হাজারো বাঙালি নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে নববর্ষকে বরণ করবে। এছাড়া পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজন করা হয়েছে ৩ দিনব্যাপি অনুষ্ঠানমালা। ১লা বৈশাখ সকাল সাড়ে ৮টায় বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ উদযাপন উপলক্ষে ইউনেস্কো কর্তৃক মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ‘ওহঃধহমরনষব ঈঁষঃঁৎধষ ঐবৎরঃধমব’ এর তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার বিষয়টিকে গুরুত্বারোপ করে কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ নিমতলা হতে মঙ্গল শোভাযাত্রা ও বর্ণাঢ্য র‌্যালি, সকাল ১০টা হতে কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ নিমতলায় বৈশাখী মেলা ও বাউল উৎসব ১৪২৬ উদ্বোধন ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সকাল ১১টায় শিশু একাডেমি প্রাঙ্গণে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বস্ব ব্যবস্থাপনায় উৎসবমুখর পরিবেশে ও আড়ম্বরে বাংলা নববর্ষ উদযাপন, প্রতিষ্ঠানে ছাত্রছাত্রীদের মাঝে রচনা প্রতিযোগিতা, হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা ও শিশু পরিবারসমূহে ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন, শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে বাঙালি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন, কারাবন্দীদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কয়েদিদের তৈরী বিভিন্ন দ্রব্যাদির প্রদর্শন, ২ বৈশাখ কালেক্টরেট প্রাঙ্গণ নিমতলায় দিনব্যাপী (বিকেল ৫টা পর্যন্ত) গ্রামীণ মেলা, বেলা সাড়ে ৩টা হতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ৩ বৈশাখ সারাদিনব্যাপী (বিকেল ৫টা পর্যন্ত) বৈশাখী মেলা ও বাউল উৎসব এবং প্রামাণ্য চিত্র প্রদর্শনী, বেলা সাড়ে ৩টা হতে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে হবিগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী বর্ণমালা খেলাঘর আসর শিরিষতলায় (লন টেনিস মাঠ) নতুন বছরকে বরণ করতে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। খেলাঘর আসর হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক দীপুল কুমার রায় জানান, এ বছর সকাল সাগে ৭টায় নবসূর্যের বরণ, সাড়ে ৮টায় নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এমপি অ্যাডভোকেট মোঃ আবু জাহির। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন জেলা প্রশাসক মাহমুদুল কবির মুরাদ, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ উল্ল্যাহ (বিপিএম, পিপিএম সেবা), খেলাঘর আসর হবিগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি শহীদ উদ্দিন চৌধুরী, হবিগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ জাহান আরা খাতুন, খেলাঘর কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য বাদল রায়। অনুষ্ঠানে জাতীয় পর্যায়ে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখায় ২ শিশু ও একটি সংগঠনকে সম্মাননা দেয়া হচ্ছে। তাছাড়া নববর্ষের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ও দর্শকদের জন্য রয়েছে নবান্নের খই ও নাড়–।
সরকারি বৃন্দাবন কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক আ.ব.ম ফখরুদ্দিন খান পারভেজ জানান, বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বৃন্দাবন সরকারি কলেজ আব্দুল হামিদ বৈশাখী মঞ্চে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে রয়েছে সকাল ৮টায় কার্যক্রমের উদ্বোধন, সকাল ৮টা ১০ মিনিট থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সকাল ১১টায় শুভেচ্ছা জ্ঞাপন। কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মোঃ এলিয়াছ হোসেনের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন এমপি আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট মোঃ আবু জাহির।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিওগুলো এ উপলক্ষে প্রচার করবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। নির্বিঘেœ উৎসব পালনে দেশব্যাপী কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে বৈশাখী মেলাসহ নানা উৎসব অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমাদের সংস্কৃতিতে বারো মাসে তেরো পার্বণের ব্যাপারটি মিলেমিশে আছে। বেশির ভাগ উৎসবই ধর্মীয় আচার-আচরণ সমৃদ্ধ। বাকি সব উৎসব লোকজ চেতনার উপর দাঁড়ানো। বাংলা নববর্ষ সে উৎসবের মধ্যে অন্যতম। পহেলা বৈশাখ একটি সার্বজনীন উৎসব। এই দিনে সবাই ভুলে যাবে সব ভেদাভেদ, হিংসা-বিদ্বেষ। নতুন বছর মানুষকে নতুন করে উজ্জীবিত করে বাঁচতে শেখায়। তাই, নববর্ষের প্রথম দিন সবাই উদযাপন করে প্রাণভরে। নববর্ষে প্রথম দিন সবার জন্য শুভ হোক এবং ভরিয়ে দিক সকলের প্রাণের চাহিদা। শুভ বাংলা নববর্ষ ১৪২৬ বঙ্গাব্দ।
-