বৃষ্টি উপেক্ষা করে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের ভীড়-
মোঃ মামুন চৌধুরী ॥ জেলার এক পাশে পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত চা বাগান। আছে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও কালেঙ্গা অভয়ারণ্য। চা বাগানের ছড়া। এসব মনোরম স্থান পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ছে। পবিত্র ঈদুল ফিতরের ছুটিতে হবিগঞ্জের বৃষ্টি¯œাত সাতছড়িতে পর্যটকরা মেতেছিল। প্রাকৃতিক রুপে এ ঈদে প্রিয়জনদের নিয়ে মন খুলে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দটা পর্যটকরা উপভোগ করেছেন।
সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাকৃতিক মনোরম স্থানগুলো ছিল পর্যটকদের উপস্থিতি। অনেককে দেখা গেছে প্রিয়জনের হাত ধরে একে অপরের চোখে তাকিয়ে থাকতে। আবার অনেককে দেখা যায় জড়িয়ে ধরে আনন্দ উপভোগ করতে। পাহাড়ি এলাকার পাশাপাশি শহরের নানা স্থানেও প্রিয়জনদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানোও লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষ করে কষ্টের বিষয় ছিল অনেককে তাদের প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকাটা। কথা ছিল আসার। আসেনি প্রিয়তমা। অন্যের আনন্দ দেখে তাদেরকে সময় পার করতে হয়েছে। এতে হতাশা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। চুনারুঘাট উপজেলার সাতছড়ি উদ্যানে সকালেই কাজল নামে এ পর্যটক আসেন। কথা ছিল তার প্রিয়তমা জলিকেও আসার। দুপুর হলেও কাজল তার জলির দেখা পায়নি। কি যে মনে তার কষ্ট। পাশে থেকে কিছুটা অনুভব করতে পেরে তার সাথে কথা বলা থেকেই এ তথ্য জানা।
কিন্তু কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে পর্যটক কম থাকায় নির্জনে লেকের পাড়ে শাহীন তার প্রিয়তমাকে নিয়ে বেশ ভালই ছিলেন। তার ন্যায় বনাঞ্চলের অরণ্যে প্রিয়জন জুটিরা আনন্দেই কাটিয়েছেন। প্রকৃতির সৌন্দর্য মন্ডিত সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গার অভয়ারণ্য। এ ঈদে আগন্তুকদের জন্য কর্তৃপক্ষ ঢেলে সাজিয়েছিলেন। নেওয়া হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। বনের ভেতরে ৭টি ছড়া রয়েছে বলেই এর নাম হয়েছিল সাতছড়ি। বনের ভেতরে এঁকেবেঁকে চলেছে বালুময় ছড়াগুলো।
সাতছড়ি জাতীয় উদ্যান ও রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্যে দর্শনার্থীদের আগমণ বাড়াতে বন বিভাগ, প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ ও সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটি এর পক্ষ থেকে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ।
দর্শনার্থীদের সহজেই সুপেয় পানি, টয়লেট সুবিধাসহ নিরাপত্তা সুবিধা নিশ্চিতের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও ছিল তৎপর। অনায়াসেই ভ্রমণ পিপাসুরা সাতছড়ি ও  রেমা-কালেঙ্গা, চা বাগানে প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়িয়ে যেতে পারছেন।
ঢাকা ও সিলেট থেকে মাত্র ৪ থেকে সাড়ে তিন ঘন্টার পথ। জগদীশপুর মুক্তিযোদ্ধা চত্ত্বর এলাকায় নেমে মাত্র ৩০ মিনিটে অথবা শায়েস্তাগঞ্জ নতুন ব্রিজে নেমে সেখান থেকে ৫০ মিনিটে যেতে পারেন সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে।
তেলিয়াপাড়া রেল গেইট পার হলেই চোখে পড়বে যেন নিপুণ শিল্পীর হাতে গড়া সবুজ চা বাগান। তবে রেমা-কালেঙ্গা যেতে সময় আরো বেশি লাগবে।
রেঞ্জ কর্মকর্তা মাহমুদ হোসেন জানান, সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে দর্শনার্থীদের জন্য অনেক সুযোগ-সুবিধার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ঈদে নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা ছিলেন তৎপর। নানা রকমের দুর্লভ গাছ পালাসহ হনুমান, বানর, মায়া হরিণ, পাখি দর্শনার্থীরা উপভোগ করেছেন। ইতোমধ্যে দূরবর্তী পর্যটকদের জন্য উদ্যানে রাত্রী যাপনে আবাসিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এসব থাকায় সাতছড়িতে দিন দিন পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। 
বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ জানায়, কালেঙ্গার চেয়ে সাতছড়িতে পর্যটক সমাগম বেশি হয়। কারণ এখানে যাতায়াত সহজ। আর রেমা-কালেঙ্গায় যেতে সময় একটু বেশি লাগবে। তারপরও সেখানে অনেক পর্যটকের সমাগম হচ্ছে।
কালেঙ্গা রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, রেমা-কালেঙ্গার অভয়ারণ্য মূলত তরফ পাহাড় সংরক্ষিত বনভূমির একটি অংশ। যা দেশের প্রাকৃতিক পার্বত্য বনভূমির মধ্যে সর্ববৃহৎ। অভয়ারণ্যটি এ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার গাজীপুর ও রানীগাও ইউনিয়নে অবস্থিত। এ বনাঞ্চলটি ঢাকা থেকে আনুমানিক ১৪০ কিলোমিটার উত্তর পূর্ব দিকে এবং সিলেট থেকে ১০০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিম দিকে অবস্থিত। বনাঞ্চলটি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর বিস্তৃত।
অপেক্ষাকৃত দুর্গম স্থানে অবস্থিত বলে এই সমৃদ্ধ মিশ্র চিরহরিৎ বনটি এখনো টিকে আছে। অভয়ারণ্যটির আশেপাশে রয়েছে ৩টি চা-বাগান। এটি বিভিন্ন বিরল প্রজাতির উদ্ভিদ ও পশুপাখির আবাসস্থল এবং বিশেষ করে পাখি দর্শনে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্থান।
পূর্ববতী জরিপ মতে, এখানে ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৬৭ প্রজাতির পাখি, ৭ প্রজাতির উভচর, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ এবং ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। আদিবাসী সম্প্রদায় ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও উড়ং এই বনভূমির আশেপাশে এবং অভ্যন্তরে বসবাস করছে। বিরল প্রজাতির বাঘের বিচরণও রয়েছে এ জঙ্গলে। জঙ্গলটি পরিদর্শনে যে কেউ মুগ্ধ হবে।
-